পিয়ন থেকে কেউ এখন হিসাবরক্ষক, কেউ আবার প্রধান সহকারী। পরিচালকের এমন স্নেহধন্য তিন কর্মচারীর হাতে বদলি, বদলি প্রত্যাহার ও আউটসোর্সিংদের ভাগ্য নির্ধারণ হচ্ছে। ভুক্তভোগী আউটসোর্সিং-এর একাধিক সদস্য ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছেন।
পিয়ন পদে চাকরি শুরু শাহারিয়ার আলম রাসেলের ২০১২ সালে। পদোন্নতি পেয়ে এখন হয়েছেন হিসাব রক্ষক। বাড়ি বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার শামবাগাত গ্রামে। অপকর্মে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে তিনিই এখন পরিচালক দপ্তরের মুকুটহীন সম্রাট। পরিচালকের অপকর্মের আর এক সহযোগী শামীম আহসানও পিয়ন পদে যোগদান করে বর্তমানে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের প্রধান সহকারী হিসেবে কর্মরত।
কচুয়া উপজেলা সদরের এ ব্যক্তি চাকরিতে যোগদান করেন ২০১৪ সালে। অপর অপকর্মের হোতা পোর্ট হেলথ অফিসের প্রধান সহযোগী মোঃ নাজমুল ইসলাম। বদলি ও বদলি প্রত্যাহার ছাড়াও এ তিনজন এর মাধ্যমে ৪৬ জন আউটসোর্সিং কর্মচারীদের কাছ থেকে গত জুলাই মাসে ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ইতোমধ্যে কয়েকজন আউটসোর্সিং কর্মচারীকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ারও খবর পাওয়া গেছে। আবার বেশ কয়েকজনকে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিনিময়ে নিয়েছেন মোটা অঙ্কের টাকা বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছেন।
বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার হোগলগাতি গ্রামের মনিরুল ইসলামের ছেলে কামরুজ্জামান সোহেল ২০১৮ সাল থেকে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত। বক্ষব্যাধিতে চাকরি করতে গিয়ে রোগীদের সংস্পর্শে সোহেল নিজেই যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করলে তাকে চলতি বছরের ১২ জুলাই দুই মাসের ছুটি দেন। এর আগে তার চাকরি বহাল রাখার দায়িত্ব নেন বক্ষব্যাধি হাসপাতালের প্রধান সহকারী শামীম আহসান বলে জানান সোহেল।
তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, বিনিময়ে ৬ জুলাই বিকেল ৫টায় গল্লামারী জিরো পয়েন্টের গোল চত্বরের সামনে থেকে শামীম আহসান দেড় লাখ টাকা নেন তার কাছ থেকে।
তিনি বলেন, গত ৪ জুলাই দুই বছরের বেতন এক সাথে উত্তোলন করেন ৪৬ জন আউটসোর্সিং কর্মচারী। বক্ষব্যাধির ১৫ জন কর্মচারীর প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫০ হাজার করে মোট সাড়ে ৭ লাখ টাকা ৬ জুলাই ওই শামীম আহসানকে ঘুষ দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
ডিউটিরত অবস্থায় জুলাই মাসে অব্যাহতি দেওয়া দিঘলিয়ার বারাকপুর গ্রামের উত্তম শীল বলেন, চাকরি বহাল করার কথা বলে পরিচালক অফিসে আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত আলাউদ্দিনের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়া হয়।
বড় বাবু শামীম আহসান তার সাথে সব সময় খারাপ ব্যবহার করতেন দাবি করে বলেন, একটি চক্র এ অব্যাহতি কাজে জড়িত। তবে অভিযুক্ত শামিম আহসান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার বিরুদ্ধে মানহানির এবং চাঁদাবাজি মামলা করা হয়েছে। তবে মামলা করার তারিখ ও নম্বর বলতে পারেননি।
পোর্ট হেলথ অফিসের আউটসোর্সিংয়ের আব্দুর রহিমকে পরিচালক অফিসে কাজের জন্য আনা হয়। সেখানে কর্মরত থাকা অবস্থায় বিদ্যুতের তার চুরি হয়। ওই অপরাধে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেনের মাধ্যমে শাহারিয়ার আলম রাসেল ও মুকুল তাকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করেন এমনটি জানিয়েছেন ওই দপ্তরের একাধিক সূত্র। পোর্ট হেলথের আরও এক আউটসোর্সিং কর্মচারী নিরাপত্তা প্রহরী আরিফ হোসেনকে দীর্ঘ দিন অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন।
ওই ভুক্তভোগী খালিশপুর থানায় ৪ জুলাই অভিযোগ করে, দু’বছরের বেতনের টাকার অর্ধেক ঘুষ দাবি করে পরিচালকের ভাগ্নে পরিচয়দানকারী মুকুল ও পোর্ট হেলথের অফিস সহকারী নাজমুল হোসেন। তাকে আটকে রেখে ৩’শ টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেন এবং জাতীয় পরিচয় পত্র জোর করে কেড়ে নেন বলে ওই লিখিত অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়।
এসব অপকর্ম ঢাকতে একাধিক চিঠি করা হয়েছে পোর্ট হেলথ অফিস থেকে। তার বেতনের টাকা তুলে অফিস সহকারী নামজুল হোসেনের কাছে রাখা হয়েছে এমন নাটকও সাজানো হয়েছে। সেখান থেকে জোর করে আরিফ হোসেন টাকা ছিনিয়ে নিয়েছেন এ গল্পও সাজানো হয়েছে।
৪৫.৪০.০০০০.০১৮.২.০০১.২৬-১০১৮ স্মারকে পোর্ট হেলথ অফিসার পরিচালকের কাছে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন তার কাছ থেকে টাকা ফেরতের জন্য ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর এবং জাতীয় পরিচয় পত্র গ্রহণ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী বলেন, দু’বছরের বেতনের অর্ধেক টাকা না দেওয়ায় নানা প্রকার নাটক সাজিয়ে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এখনও তার অর্জিনাল জাতীয় পরিচয় পত্র ফেরত দেওয়া হয়নি এবং খালিশপুর থাকায় অভিযোগ দেওয়ায় নানা প্রকার হুমকি ধামকি দিচ্ছেন।
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত তাদের হাতে শুধু খুলনা শহর এলাকার ৫ জন আউটসোর্সিং কর্মচারী চাকরিচ্যুত হয়েছেন। এ পাঁচজন হচ্ছেন, পোর্ট হেলথ অফিসের আরিফ হোসেন, সাগর মোল্লা, আব্দুর রহিম, বক্ষব্যাধি হাসপাতালের কামরুজ্জামান সোহেল ও উত্তমশীল।
তবে শাহারিয়ার আলম রাসেল কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে কোন প্রকার তথ্য দিতে রাজি হয়নি।

